বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিতে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন, দেশে তেল পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এলপিজি খাতে সরকারের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নিজেদের কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে সরকারি সংস্থাটি (বিপিসি) সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম সভায় এসব প্রস্তাব দেয়।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মজুত বাড়াতে হবে। তা না হলে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারের জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন।
বিপিসি জানায়, আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ সালের মার্চ থেকে সংস্থাটি লোকসানের মুখে পড়েছে। সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা চেয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা আধুনিকায়ন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠনের বিষয়টি এখনো ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে। এ তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, ‘সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ করছে। এ ধরনের তহবিল গঠন করা গেলে যেকোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে তা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।’
বিপিসির চেয়ারম্যান জানান, সংসদীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সংশ্লিষ্ট সভায়ও বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে এ সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে তিন মাসের চাহিদার সমপরিমাণ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
এসপিএম ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, এ প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (কার্যাদেশ প্রদানের বিজ্ঞপ্তি) গ্রহণ করা হয়েছে। ২৮ দিনের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে।
সংসদীয় কমিটির সভায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া পরবর্তী সভায় জ্বালানির বর্তমান চাহিদা, সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপনের সুপারিশ করে কমিটি।
দাম সমন্বয়ের পরও বাড়ছে জ্বালানি তেলে লোকসান
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ লোকসানের কারণে সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে।
সংস্থাটি জানায়, প্ল্যাটসের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক মূল্য ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার থাকলে ডিজেল বিক্রিতে তাদের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় থাকে। তবে ২০২৬ সালের ১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বেঞ্চমার্ক মূল্য গড়ে ব্যারেল প্রতি ১৬৫ দশমিক ৮২ ডলারে পৌঁছায়।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে প্রতি লিটার ডিজেলে লোকসান হচ্ছে ৫৪ টাকা ৬২ পয়সা। এতে দৈনিক প্রায় ৮৪ কোটি টাকা, মাসে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সামাল দেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সংস্থাটি মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছে।
আমদানি ব্যয় কমাতে দ্রুত চালু করতে হবে এসপিএম
আমদানির জ্বালানি খালাসে সময় ও ব্যয় কমাতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থা দ্রুত চালু করাকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিপিসি।
সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে বড় জাহাজ থেকে আমদানি করা জ্বালানি খালাসের প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এসপিএম অবকাঠামো, পাম্পিং স্টেশন এবং ট্যাংক ফার্ম চালু হলে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য খালাসের দক্ষতা বাড়বে।
আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশে তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো, পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিপোতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর কাজ দ্রুত করার প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
বিপিসির অধীনে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি, তিনটি জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানি- পদ্মা অয়েল পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম পিএলসি ও যমুনা অয়েল পিএলসিসহ জ্বালানি পরিবহন, এলপিজি বোতলজাতকরণ এবং লুব্রিকেন্ট মিশ্রণের কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৯০ দিনের মজুত গড়ার প্রস্তাব
দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদার এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে ৯০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি।
এ লক্ষ্য অর্জনে নির্দিষ্ট সময়সীমা ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি কৌশলগত মজুতের অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং সারা দেশের পেট্রোলিয়াম পণ্য বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
রেল ও নৌপথনির্ভর স্থাপনাসহ সারা দেশে বিপিসির ২৯টি ডিপো রয়েছে। এসব ডিপোর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও অর্থনৈতিক খাতে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করা হয়।
বিপিসি মনে করে, সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে আরও শক্তিশালী মজুত গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
জ্বালানি গ্রহণ, সংরক্ষণ ও বিতরণে প্রচলিত হাতে পরিচালিত ব্যবস্থাকে বড় প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিপিসি। কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানো, বিলম্ব কমানো এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরবরাহ নেটওয়ার্কে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু ও আধুনিকায়নের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক জ্বালানি সরবরাহ কাঠামো গড়ে তোলা, পাইপলাইনের ব্যবহার বাড়ানো এবং এলপিজি খাতে সরকারের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
দেশে তেল পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকেও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিপিসি।
জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা
বিপিসি জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্য নির্ধারণব্যবস্থার বিবরণও তুলে ধরে। ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
অন্যদিকে, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি ও জেট ফুয়েলসহ নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিটুমিন ও এসবিপিএর মতো পণ্যের দাম নির্ধারণ করে বিপিসি।
আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের জন্য সরকার ২০২৪ সালের মার্চে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে।
তবে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লেও বিপিসির প্রস্তাবিত হারে দেশের বাজারে দাম পুরোপুরি সমন্বয় করা হয়নি। এতে সংস্থাটির আর্থিক লোকসান বেড়েছে।
সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রেখে এ চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
দীর্ঘমেয়াদে আমদানি নির্ভরতা কমানো, এসপিএম প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, ডিপোতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং প্রস্তাবিত জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিপিসি।
সংসদীয় কমিটির সভায় জ্বালানি সরবরাহ নিরাপত্তা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের আকস্মিক পরিবর্তন মোকাবিলায় বিপিসির সক্ষমতা জোরদার করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও আর্থিক সংস্কারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
