ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৩ জন নিহত, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৩ জন নিহত, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে একটি শপিংমল প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। কর্মকর্তারা বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন।

মঙ্গলবারের ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুমামোতো এলাকায় বহু বাড়িঘর মাটিতে মিশে যায়। আগুন লাগে। সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক হাজার মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। ২০১৬ সালে একই এলাকায় পরপর দুটি ভূমিকম্পে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। জাপানের কুমামোতো থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, ‘হতাহত, ভবন ধস, অগ্নিকাণ্ড এবং সড়কের ক্ষতিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে।’ এ সময় তিনি ১৩ জনের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন।

সরকারের মুখপাত্র মিনোরু কিহারা জানান, আরও সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বুধবার ভোর পর্যন্ত কিউশু দ্বীপের তিনটি অঞ্চলে ৫০৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৯ সহস্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয় অনেক বাসিন্দা বলেন, জীবনে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প তারা আগে অনুভব করেননি। জাপানের সাত ধাপের ভূমিকম্পের তীব্রতা নির্ধারণের ‘শিনদো’ স্কেলে এটি সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছায়। এ মাত্রায় দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইয়াতসুশিরোর একটি বিলাসবহুল অনসেন উষ্ণ প্রস্রবণ সরাইখানার ৭৩ বছর বয়সী মালিক কানজো মাতসুমোতো এএফপিকে বলেন, ‘এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। ক্ষয়ক্ষতি থেকে এই অঞ্চল আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, জানি না।’

৩৫ বছর বয়সী নিয়োগ পরামর্শক চিহারু হারা এএফপিকে বলেন, ভূমিকম্পের সময় তিনি ‘ভীতসন্ত্রস্ত’ হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘অফিসটি প্রচণ্ডভাবে এদিক-ওদিক দুলছিল। মনে হচ্ছিল ভবনটি ভেঙে পড়বে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।’

মৃতদের মধ্যে অন্তত দুজন নারী রয়েছেন। ভূমিকম্পের প্রায় আধা ঘণ্টা পর কাশিমা শহরের একটি শপিংমলে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় তারা মারা যান। বিস্ফোরণে শপিংমলটির বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। এর আগে ভূমিকম্পের পর সেখানে কয়েক ডজন আফটারশক অনুভূত হয়।

শপিংমলের ভেতরের ভিডিওতে দেখা যায়, কমলা রঙের পোশাক ও সাদা হেলমেট পরা উদ্ধারকর্মীরা মোচড়ানো ইস্পাতের কাঠামো, ঝুলে থাকা তার এবং ভেঙে পড়া ছাদের অংশের মধ্য দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন।

শপিংমল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইওনের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, ‘ক্রেতা ও কর্মীরা ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’

স্থানীয় এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানান, শপিংমল থেকে আটজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন আহত।

প্রাথমিক খবরে বলা হয়েছিল, শপিংমলের ভেতরে ২০ থেকে ৩০ জন আটকা পড়েছেন। তবে বুধবার সকালে সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে পুলিশের বরাত দিয়ে জানায়, আটকে পড়া মানুষের সংখ্যা ‘এর চেয়ে কম।’

এদিকে ইয়াতসুশিরোতে নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানায় নয়জনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। কর্মকর্তারা জানান, সেখানে লাল-সাদা রঙের একটি চিমনির অংশ ভেঙে নিচের বিশাল কারখানার ওপর পড়ে।

কর্মকর্তারা জানান, বুধবার সকাল পর্যন্ত কুমামোতোজুড়ে ৩৬ হাজার ৮৮০টি পরিবার ও স্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে  ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) এর মাত্রা ৬ দশমিক ৮ এবং উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ১০ কিলোমিটার বলে জানায়।

ভূমিকম্পে একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ঐতিহ্যবাহী ‘তোরিই’ তোরণ ভেঙে পড়ে। বহু সড়কে ফাটল দেখা দেয় এবং অনেক সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বুধবারও শিনকানসেন বুলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

ভিডিওচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন কুমামোতো দুর্গের দেয়ালের কিছু অংশও ধসে পড়তে দেখা গেছে।

কুমামোতো বিমানবন্দর কয়েক ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবার চালু করা হয়।

জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশটির সেনাবাহিনীর ৩ হাজার ৬০০ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি আকাশপথে ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণে ২০টি বিমান পাঠানো হয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি জাপান। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর পশ্চিম প্রান্তে চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দেশটির অবস্থান।
প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দ্বীপদেশে প্রতিবছর শত শত ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই জাপানে ঘটে।

এসবের বেশিরভাগই তুলনামূলকভাবে মৃদু। তবে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে ভূমিকম্পের অবস্থান এবং ভূ-পৃষ্ঠের কত গভীরে এর উৎপত্তি হয়েছে তার ওপর।

২০১১ সালের ৯ দশমিক ০ মাত্রার শক্তিশালী সমুদ্রতলের ভূমিকম্পের স্মৃতি এখনও জাপানকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ওই ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামিতে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি বা নিখোঁজ হন। একই সঙ্গে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।